মেনু নির্বাচন করুন

কাশিল ইউনিয়নের ঈদগাহ এর তালিকা‍:
ত্রূমিক নংঈদগাহগ্রাম
১.বাথুলী সাদী ঈদগাহবাথুলী সাদী
২.কাশিল ঈদগাহকাশিল

কাশিল ইউনিয়নে ১৯ টি গ্রামে প্রায় প্রতিটি গ্রামে রয়েছে ঈদগাহ-এর মাঠ প্রতিবছর ধর্মপ্রান মুসলমানগন একত্রিত হয়ে ঈদের নামাজ পড়ে থাকে আনন্দের সাথে।

ঈদের আগের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় ঈদের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। বিভিন্ন রকম পিঠে তৈরী হয়। মিষ্টি, নোনতা। কোরানো নারকোল চিনি জিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরী হয় সমোসার পুর। ময়দার রুটি বেলে পছন্দমত আকারে কেটে নিয়ে তাতে নারকোলের পুর দিয়ে তৈরী হয় সমোসা। বিভিন্ন আকারের। কোনটা তেকোণা, কোনটা পুলির মত তো কোনটা আবার দোকানের সিঙাড়ার মত দেখতে। ভাজা হয়ে গেলে ঘন করে জ্বাল দেওয়া চিনির রসে ডুবিয়ে তুলে রেখে দাও বড় গামলায়। ঈদের দিনে শরবত আর সেমুইএর সাথে এই সমোসাও দেওয়া হবে মেহমানদের। সাথেই ভেজে রাখা আছে খাস্তা নিমকি। যে মিষ্টি সমোসা খাবে না , তার জন্যে!

ভোরের আজানের সাথেই উঠে পড়েন মা, চাচি আর ফুফুরা। ফজরের নামাজ সেরে অন্ধকার থাকতেই তারা ঢুকে পড়েন রান্নাঘরে। পুরুষেরা মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ সেরে এসে হাঁক-ডাক শুরু করেন, এই পোলাপান, এখনও ঘুমাইতেছস? শিগগির ওঠ! সকাল হইয়া গ্যাসে তো! গোসল কইরা রেডি হ সব, নামাজে যাবি না? মাঝরাত পার করে ঘুমুতে যাওয়া সব ছেলে-মেয়ে, আমরা, চোখমুখ কচলে সোজা পুকুরে। মুখ ধুয়ে ঘরে আসতে আসতে টেবিলে হাজির আগের দিনে তৈরী করে রাখা সব সমোসা, নিমকি আর এক্ষুনি রান্না করা সেমুই, সুজির হালুয়া। এই সুজির হালুয়াটা দাদুর ফেভারিট। ঘরে বানানো, কিনে আনা যত খাবারই থাকুক, দাদুর সুজির হালুয়া চাইই চাই। ফ্লাস্ক ভর্তি চা আর ট্রেতে রাখা সব কাপ ডিশ। আমরা পোলাপানেরা তখন চা পেতাম না। আমাদের জন্যে জাগে আছে গরম দুধ। দুধ আমি একদম পছন্দ করি না, আমি চা ই খেতে চাই, কিন্তু চাইলেও কি পাওয়া যায়? দাদি বলে, চা খেলে নাকি আমি আরও কালো হয়ে যাব! অগত্যা : দুধ!

ভেতরবাড়ির উঠোনে তখন কাকার তদারকিতে কসাই খাসির মাংস টুকরো করছে। ভোরেই জবাই হয়েছে খাসি। কাজের বুয়ারা ঘুরঘুর করছে আশে-পাশেই। খাসির কলিজা, দিল, মগজ এগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্যে। একটা ঝাল ঝাল কষা হবে লুচির সাথে খাওয়ার জন্যে।সেটা মা রাঁধবে। খাওয়ার ঘরে তিন-চারজন বসে বেলছে লুচি। মা মাঝে মাঝেই রান্নাঘর থেকে উঠে এসে দেখে যাচ্ছে লুচি বেলার কদ্দূর কি হল। কুলোতে খবরের কাগজ পেতে রাখা হচ্ছে বেলা লুচি, কুলো ভরে উঠলেই এক ছুট্টে আমি সেটা রান্নাঘরে নিয়ে যাচ্ছি ভাজার জন্যে, ( আমিও বসে লুচি বেলছি কি না! ) সেখানে চাচি লুচি ভাজছে। এই লুচিগুলো বেশ বড় বড়। আর ভাজাও হয় একটু কড়া করে। অত লোকের বাড়িতে সকলের নাশতার জন্যে ছোট ছোট লুচি বেলতে বেলতেই নাকি রাত হয়ে যাবে, তাই দাদির পরামর্শে লুচিগুলো আকারেও বড় আর ওজনেও ভারী!

চন্দ্রবৎসরের হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছরই রোযা দশ দিন করে এগিয়ে আসে। ছেলেবেলায় রোযা হত পুরো গরমকালে। যদ্দূর মনে পড়ছে আগষ্ট -সেপ্টেম্বর মাস ছিল সেটা। কিংবা হয়ত আরেকটু আগের কথা বলছি। জুলাই-আগষ্ট। দিন তারিখগুলো বেশ ভালই গুলিয়েছে বুঝতে পারছি। তখন চাঁদ দেখা নিয়ে এত ঝামেলা ছিল না। সবাই আশা করতেন যে রোযা তিরিশ দিনেই শেষ হবে, আর বেশিরভাগ তাই হত। কোন বছর ২৯দিনেই চাঁদ দেখা যেত। মসজিদের ঘোষণার প্রয়োজন হত না আর চাঁদ দেখা কমিটিও তখন ছিল না। গরমকালের পরিস্কার আকাশে আমরা বারান্দা থেকেই দিব্যি চাঁদ দেখতে পেতাম। ছোট্ট একসুতো বাঁকা চাঁদ। আকাশের এক কোণে মুখ বাড়িয়েছে খানিকক্ষণের জন্যে। নিয়ে এসেছে খুশির ঈদের খবর। একমাসের সিয়াম সাধনা শেষ। কাল ঈদ। দাদি উঠে যেতেন ছাদে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে দু হাত তুলে রেখেছেন বুকের কাছে প্রার্থনার জন্যে। এটা নাকি চাঁদ দেখার দোয়া। দাদির দেখাদেখি আমরাও হাত দু হাত বুকের কাছে তুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দাদি কি দোয়া পড়ছেন কিছুই জানি না, দাদির প্রার্থনা শেষ হলে হাত দুটো নিজের গোটা মুখে বুলিয়ে 'আমীন' বলে প্রার্থনা শেষ করেন, আমরাও তাই করি। নিচে তখন রেডিওতে বাজছে নজরুলের সেই অবিস্মরণীয় গান,

রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
আপনাকে তুই বিলিয়ে দে , শোন আসমানী তাগিদ।
তোরা সোনা-দানা, বালাখানা সব রহে ইল্লিল্লাহ
দে যাকাত , মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ
ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমণ, হত মেলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরীদ।
রমযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ।
যারা জীবন ভরে রাখছে রোযা, নিত্য উপবাসী
সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ
রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।
এলো খুশির ঈদ এলো, এলো খুশির ঈদ। এলো খুশির ঈদ,
ও মন রমযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ।


  কাশিল ইউনিয়নে  প্রতিটি গ্রামে ঈদগাহের মাঠ আছে, যেখানে ঈদের নামাজ পড়া হয়। বেশ বড় মাঠ দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া থাকে। যেখানটায় দাঁড়িয়ে ইমাম ঈদের নামাজ পড়ান, সেখানে বেশ কারুকাজও করা থাকে, যেমনটি মসজিদে থাকে। এই ঈদগাহের মাঠ আছে প্রায় প্রতি গ্রামে জেলা শহরে আর বড় শহরে। ঈদের নামাজ মানুষ বড় জমায়েতে পড়তে পছন্দ করেন বলে পাড়ার মসজিদে ছোটখাট জামাত হয় না। বড় বড় মসজিদগুলোতে ঈদের জামাত হয় কিন্তু গ্রামে সকলেই ঈদগাহে নামাজ পড়েন। দাদু, আব্বুরা ঈদ্‌গাহ থেকে ঈদের নামাজ সেরে ফেরার সময় চলে যান কবরস্থানে।

যেখানে শুয়ে আছেন পূর্বপুরুষেরা সব। আত্মীয়-বন্ধু, পড়শী। কারও বা সন্তান। কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সমবেত নীরব প্রার্থনা করেন ঈদগাহ ফেরত সব মানুষ। কবরবাসী মানুষগুলোর জন্যে। তাদের আত্মার শান্তির জন্যে। নতুন পাঞ্জাবী লুঙ্গি আর টুপি পরিহিত সব পুরুষেরা, বাচ্চা ছেলেরা। সুগন্ধী আতরের সুবাস ছড়িয়ে যায় গোটা কবরস্থানে। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে কবরস্থানে। কারও হয়ত সদ্য হারানো কোন প্রিয়জন শুয়ে আছে এই কবরস্থানে, তার গাল বেয়ে নামে জলের ধারা। নি : শব্দ সব মানুষ বাড়িমুখো হন কবরস্থানকে পিছনে ফেলে।

 

 ঈদের আনন্দে মেতে উঠুন ভাল থাকুন।